ভারতের দলিত সম্প্রদায়

প্রকাশিত: ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২০

ভারতের দলিত সম্প্রদায়

ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালের আগস্টে ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যদিয়ে পাকিস্তান-ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। উপমহাদেশ একদিকে যেমন স্বাধীন হলো অপর দিকে তেমনি এই অঞ্চলে জাতি-শ্রেণি সমস্যা নতুন করে সামনে আসে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও উপমহাদেশে জাতি-শ্রেণি সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি। জাতি সমস্যা ও শ্রেণিগত শোষণের ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক বাঙালি লেখক আহমদ ছফা বলেছিলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়াকে পথ দেখাবে। জাতি-শ্রেণি সমস্যাকে কেন্দ্র করেই শ্রীলঙ্কায় সিংহলিদের সঙ্গে তামিলরা গৃহযুদ্ধ শুরু করে। বহু রক্তে জড়িয়ে ২০০৯ সালে তামিলদের দমন করা হয় তথাপি জাতি সমস্যা অমীমাংসিতই থেকে যায়। একইভাবে পাকিস্তানের জাতি সমস্যার সমাধান হয়নি বেলুচদের সঙ্গে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর লড়াই এখনো চলছে।

উপমহাদেশের বৃহত্তম দেশ ভারত শুরু থেকেই সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে নাকি হিন্দু রাষ্ট্র হবে এ নিয়ে কংগ্রেসের মধ্যেই তুমুল আলোড়ন চলছিল। একদিকে ছিল গান্ধী- নেহরু পক্ষ অন্যদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও হিন্দু মহাসভার নেতৃবৃন্দ। এই বিতর্কের সমাধান হয় ১৯৭৬ সালে ভারতকে সাংবিধানিকভাবে সেকুলার রাষ্ট্র ঘোষণার মধ্য দিয়ে। বহুজাতি ও রাজ্যের সমষ্টি ভারত ১৯৭৬ সালে সেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে সাংবিধানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতের রাজনীতি ঠিক তার উল্টোপথে চলছে। ২০১৪ সালের পর ধর্মপরিচয়কে প্রধান্য দিয়ে নাগরিকপঞ্জি করা এবং মুসলিম ও দলিত শ্রেণির ওপর উচ্চবর্ণের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের নির্যাতন ও শোষণ নিয়ে সারা ভারতজুড়ে উত্তাল দশা শুরু হয়েছে।

ভারতে নাগরিকপঞ্জি প্রণয়নের রাস্তাটি দেখান অটল বিহারি বাজপেয়ির সরকার। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইন পাস করান। এই আইনেই প্রথম ‘বেআইনি অভিবাসী’ শব্দটি স্বীকৃতি পায়। ভারতের নাগরিকত্ব বিষয়ে এই আইনে তিনটি বিষয় ছিল। এক. প্রথম ‘বেআইনি অভিবাসী’ শব্দটি নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে আইনি স্বীকৃতি পায়। দুই. ‘বেআইনি অভিবাসী’দের সন্তানরা ভারতের মাটিতে জন্ম নিলেও তারা নাগরিকত্ব পাবে না। তিন. আইনের ১৪(এ) ২ নম্বর ধারার মাধ্যমে সারা ভারতে নাগরিকপঞ্জি কার্যকর করার কথা বলা হয়। এই আইনের মূল লক্ষ্যবস্তু ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠী, হিন্দু দলিত সম্প্রদায় ও ১ কোটি ৩০ লাখ উদ্বাস্তু মানুষ যারা বিভিন্ন ধর্ম-জাতি ও শ্রেণি পেশার। ভারতের মোট নাগরিকের মধ্যে দলিতরা ১৭ শতাংশ। পূর্ব-বাংলা থেকে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় লাখ-লাখ হিন্দু যাদের মধ্যে দলিত-নমঃশূদ্র হিন্দুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশিÑ নির্যাতন থেকে বাঁচতে ও জীবনরক্ষার জন্য ভারতে পাড়ি জমায়। সরকারি হিসাব মতে, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব-বাংলা থেকে আনুমানিক ৪১ লাখ উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে ৩৪ লাখ উদ্বাস্তুকে ১০টি রাজ্যে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত ১১.১৪ লাখ উদ্বাস্তু ভারতে প্রবেশ করে। এদের মধ্যে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ১২৫ জনকে ১৭টি রাজ্যে পুনর্বাসন করা হয়েছে। দু মেয়াদে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে ১৪.৪ লাখ উদ্বাস্তু। যাদের বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। ভারতীয় লেখক পিএন লুথরার লেখা ‘পুনর্বাসন’ বইয়ের তথ্য মতে, এই উদ্বাস্তুদের ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। অন্য এক হিসাব মতে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্বাস্তু দরিদ্র তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত নিরক্ষর ভূমিহীন কৃষক ও মজুর। এছাড়াও তাদের মধ্যে পেশাগত বৈচিত্র্যও ব্যাপক এবং শিক্ষা সচেতনতাও অনেক কম। এই শ্রেণিটি বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে দেশত্যাগের সময় ভারতে গিয়ে নাগরিকত্বের পরীক্ষা দেওয়ার চিন্তা করে প্রস্তুতি নিয়ে দেশ ছাড়েনি। ফলে বর্তমানের ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ভারতজুড়ে নাগরিকপঞ্জির যে প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে এটা দলিত শ্রেণির ওপর খড়গ নেমে আসার মতো। ১৯৮৯ সালে শ্রী আশুতোষ লাহার নেতৃত্বে সংসদীয় এস্টিমেট কমিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে যে রিপোর্ট পেশ করে তাতে দেখা যায় বেশিরভাগ উদ্বাস্তুই নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে না। ২০১৯ সালে দেশজুড়ে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সংসদীয় কমিটির রিপোর্টের ওপর গোয়েন্দা বিভাগের বয়ান অনুযায়ী সারা ভারতে নাগরিকপঞ্জি করা হলে মাত্র ৩১ হাজার ৩১৩জন উদ্বাস্তু নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে। ফলে বিজেপি দেশজুড়ে নাগরিকপঞ্জির যে এজেন্ডা নিয়েছে তাতে দলিত হিন্দুদের বড় একটা অংশ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে। যার স্পষ্টত প্রমাণ মিলে আসামের নাগরিকপঞ্জি করার পর নাগরিকত্বহীন ১৯ লাখ মানুষের মধ্যে ১১ লাখ দলিত হিন্দু। এরা দ্বিতীয়বার আবেদন করেও নাগরিকত্বের প্রমাণ না দিতে পারায় এখন রাষ্ট্রহীন। শুধু আসামেই এমন নয়, সারা ভারতেই নাগরিকপঞ্জি হলে নাগরিকত্বহীনদের বড় সংখ্যাটা হবে দলিত হিন্দু।

ভারতে দলিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ২০১৪ সালের পর নির্যাতন ও বৈষম্য আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রিসার্চ ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ সালে উত্তর প্রদেশে দলিতদের বিরুদ্ধে অপরাধ বেড়েছে ২৫ শতাংশ। হরিয়ানা ও গুজরাটেও নির্যাতনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্ডিয়া টুডের জরিপকৃত বিশ্লেষণ বলছে, প্রতি ১৫ মিনিটে ভারতে দলিতদের বিরুদ্ধে একটি করে অপরাধ সংঘটিত হয়। এবং গত ১০ বছরে দলিত নির্যাতন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। দলিত সম্প্রদায়ের জীবনমান নিয়ে ২০১১ সালের এক আদমশুমারিতে দেখা গেছে ৬০ শতাংশ দলিত কোনো অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নিতে পারছে না; ৫৩.৬ শতাংশ দলিত শিশু অপুষ্টির শিকার; ২০ শতাংশ দলিত বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না। ১৯৮৯ সালে তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের (শিডিউলড কাস্ট ও শিডিউলড ট্রাইব) বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য যে আইন করা হয়েছিল তা ২০১৮ সালের এপ্রিলে আদালতের একটি রায়ের মাধ্যমে বাতিল করে দেওয়া হয়। ইন্ডিয়া টুডের ভাষ্যমতে, এই আইনটি ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে দলিতদের নিরাপত্তা ঢাল। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতিনিধি। এই আইন বাতিলের পেছনে তারাই মূল ভূমিকায় ছিল বলে বিশ্লেষকদের মত। দলিতদের ওপর নির্যাতনের এই খড়গ ক্ষমতাসীনদের আচরণে আরও স্পষ্ট হয়। ২০১৬ সালে বিজেপি নেতা দয়াশংকর সিং বহুজন সমাজবাদী পার্টি প্রধান ও দলিত নেত্রী মায়াবতীকে ‘পতিতার চেয়েও খারাপ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। ২০১৮ সালে ৩০ মার্চ তৎকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য বিজেপি নেতা অনন্ত কুমার হেগড়ে প্রকাশ্যে দলিতদের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে দলিতদের সাক্ষাতের সময় পরিষ্কার হতে সাবান-শ্যাম্পু দেওয়া হয়।

বর্তমানে ভারতেজুড়ে নাগরিকপঞ্জি ও সিএএ’র বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ চলমান। যে নাগরিকপঞ্জির লক্ষ্য হচ্ছে খাঁটি হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সে রাষ্ট্রে দলিত হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থান কেমন হতে পারে তার একটা সম্ভাব্য আলোচনা প্রদত্ত হয়েছে। এখন দেখার বিষয় ভারত জাতি-শ্রেণি সমস্যা উতরে উঠতে পারে নাকি একটি খাঁটি হিন্দুরাষ্ট্র পত্তনের নিমিত্তে দলিত সম্প্রদায়কে আবার উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।