বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অপসংস্কৃতি এবং ক্রসফায়ার।

প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০২০

বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অপসংস্কৃতি এবং ক্রসফায়ার।

আমরা প্রায়ই শুনি ক্রসফায়ার অথবা বন্দুকযুদ্ধে, ধর্ষক,সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, ডাকাত,চোরাচালানকারী, আতঙ্কবাদী নিহত হয়েছে। যা শুনে আমরা পরম আনন্দে মেতে উঠি। ভাবি পাপি মানুষটার উচিৎ শিক্ষা হয়েছে। যে বা যারা ক্রসফায়ার করেছে তাকে মনে মনে বাহবা দিই। কেও কেও বলেন এই বাংলার জমিনে এদের ঠাই নাই , শুনলে যদিও হাসি পায়। তবু মনে আক্রোশ জাগে। এখন ব্যাক্তির আদেশে আইন হয়, বিচার হয়।বিচার বিভাগ কি বিলুপ্ত হয়ে গেলো?

গত কদিন আগে পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা রাসেদ খান। বিনা প্ররোচনায় পুলিশ তার দিকে ৩ রাউন্ড গুলি ছুড়ে। ঘটনাস্থলেই রাসেদ মারা যায়। রাসেদের পরিবার প্রত্যাহার হওয়া শামলাপুর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই লিয়াকত হোসনকে ১ নম্বর ও প্রত্যাহারকৃত টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২ নম্বর আসামি করে আরো ৭ পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়। এই ঘটনায় পুলিশের প্রতি গুরুতর  অভিযোগগুলা সামনে আসছে। গত ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর খিলক্ষেতে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে শাহিন ও নাজমুল নিহত হয়। অথচ পরিবারের দাবি তাদেরকে ১৫ দিন আগে সাদাপোশাকে পুলিশ তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যাকান্ডের প্রধান আসামি নয়ন ভন্ড নিহত হয়। কিন্তু এসব নয়ন ভন্ডরা একদিনে তৈয়ার হয় নাই। তাদের পেছনে শক্ত খুটি আছে। যেমনটা আমরা দেখি মাদক চোরাচালানকারীদের বন্দুকযুদ্ধে মারা হয় কিন্তু তাদের পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়া মোড়লদের কিছুই করা হয় না।

জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন শালিস কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে ২০১৬ সালে ১৭৭ জন নিহত হয়। ২০১৭ সালে তা কমে দাড়ায় ১৪১ জনে। কিন্তু ২০১৮ সালের জাতিয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাদক চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন স্বরুপ জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রসফায়ারে বিনা বিচারে ৪৬৬ জন নিহত হয়েছেন, যা ২০১৯/২০ সালেও এই ধারা অব্যাহত আছে। যার অধিকাংশ গ্রেফতারের আগেই বিচার বহির্ভূত হত্যা করা হয়। যা শুধু মানবাধিকার লঙ্গনই না এটা একটা ঠান্ডা মাথার খুন বলা চলে। এতে আসল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থকে যায়।

১৯৭৩ সালে তথাকথিত চরমপন্থি দমনের নামে রক্ষীবাহিনীদের মাধ্যমে শুরু হয় বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড। তারপর অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং তারও পরে ক্রসফায়ার নামে এখনো চলছে বিচারবহির্ভূত হত্যা। ২০০৪ সালে নতুন উদ্দমে র‍্যাবের নেতৃত্বে  শুরু হয় বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অপসংস্কৃতি। যুক্তরাষ্ট্রীয় মানবাধিকার সংস্থা হিওমেন রাইট জানিয়েছে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড প্রায় তিন গুন বেড়েছে এই ধারা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলছে।

তারা জনগনকে এই বার্তাটাই দিচ্ছেন যে বিচার বিভাগ কোনো রকম কার্যকর ভুমিকা পালন করতে পারছে না , তাঁদেরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু ঘটে যাচ্ছে। যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমরা পাচ্ছি সামাজিক বিশৃঙ্খলা। কোনো প্রতিষ্ঠান একে অপরের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। বিশ্বাসহীনতায় ভুগে মানুষ নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। ক’দিন আগে ধর্ষণ মামলার আসামি কয়েকজনের লাশ মিলেছে কয়েক জায়গায়। তাদের গলায় চিরকুট বাধা ছিলো ‘হারকিওলিস’, ধর্ষকের পরিনতি এই। খুবই হতাশ হলাম, সবাই  আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।

বিচার বিভাগের বাইরে কোনো বিভাগ কারো বিচার করার ক্ষমতা রাখে না। আমার কথা হলো, আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। সে রাষ্ট্র হওক কিংবা ব্যাক্তি। এসব বিচারবহির্ভূত হত্যা যদি রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানেই হয়ে থাকে তাহলে বিচার বিভাগের পেছনে এতো অর্থ ব্যায় করা হয় কেন?

একটা সদ্যোজাত স্বাধীন দেশের অচল অবস্থা কাটতে কত বছর অতিক্রান্ত হতে হয়? স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও আমাদের জান মালের নিরাপত্তা নেই। প্রতিনিয়ত চলছে ধর্ষণ,খুন, গুম, দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিন্তু আমরা কোনো আইনি সহায়তা পাচ্ছি না । একাত্তরের  রাজাকারদের এতো বছর পরেও বিচার হয়েছে, তাহলে প্রত্যেকটা মানুষকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব। বিচার বহির্ভূত হত্যা মানে খুন করা, যত বড় অপরাধীই হওক তার সঠিক বিচার পাওয়া উচিৎ। তাকে বিচারের কাঠগড়ায় না দাড়ানো পর্যন্ত তার শাস্তি অগ্রহণযোগ্য। অথচ রাষ্ট্র তাকে সেই অধিকারটুকু থেকে বঞ্চিত করে, তাকে নির্বিচারে হত্যা করে।এখানে পরিষ্কার ভাষায় বলা যায় রাষ্ট্র একজন খুনির ভূমিকায় রয়েছে। যতদিন এই বিচার বহির্ভূত হত্যার বিচার না হচ্ছে ততদিন এই রাষ্ট্র কলঙ্কমুক্ত করা যাবে না।

প্রতিটা মানুষেরই বেচেঁ থাকার এবং ন্যায় বিচার পাবার অধিকার রয়েছে। ক্রসফায়ারে বা রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়, আদালতের বিচারকার্য সম্পন্ন করেই কেবল অপরাধীকে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শাস্তি দিতে হবে।

লেখা : ইমদাদ মোহাম্মদ
যুগ্ম আহ্বায়ক,
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন 
বৃন্দাবন সরকারি কলেজ শাখা , হবিগঞ্জ।